যুক্তরাজ্যে চলতি বছর নিট অভিবাসন নেতিবাচক ধারায় নেমে আসতে পারে, যা দেশটির অর্থনীতিতে ‘আশঙ্কাজনক’ প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের। বিশেষ করে বিদেশী শিক্ষার্থী ও দক্ষ কর্মী প্রবেশে বিধিনিষেধ এবং কঠোর ভিসানীতি যুক্তরাজ্যের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন খাতে সংকট তৈরি করেছে। এর প্রভাব সরাসরি অর্থনীতিতে পড়তে পারে। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
গ্রিনউইচ ও কেন্ট ইউনিভার্সিটি সম্প্রতি একীভূত হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ব্রিটিশ সরকার অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কড়াকড়ি আরোপ করায় দেশটির অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়েছে। কারণ কঠোর বিধিনিষেধ থাকায় বিদেশী ভর্তিচ্ছুদের আবেদন কমেছে। একই সমস্যায় রয়েছে ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো। বিশেষ করে নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য ও পরিচর্যা কেন্দ্রগুলো কর্মী সংকটে ভুগছে।
নতুন নিয়ম মেনে যুক্তরাজ্যে বসবাস ও কাজের ভিসা পাচ্ছেন, এমন ব্যক্তির সংখ্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ক্রমবর্ধমান হারে কমেছে। তিন বছর আগে দেশটিতে বার্ষিক নিট অভিবাসন প্রায় ১০ লাখে পৌঁছেছিল। চলতি বছর দেশটি ত্যাগ করা মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় নিট অভিবাসন শূন্যের নিচে চলে যেতে পারে। পূর্বাভাসটি সত্যি হলে ১৯৯৩ সালের পর প্রথমবার এমনটি ঘটবে।
ওয়ারউইক ইউনিভার্সিটির ডেটা অ্যানালিস্ট জেমস বোয়েসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ নাগাদ যুক্তরাজ্যে আগত ইইউ-বহির্ভূত অভিবাসী ৫ লাখ ৫০ হাজারে নিচে নেমে যেতে পারে, ২০২৩ সালে যা ছিল ১১ লাখের বেশি।
মূলত পূর্ববর্তী কনজারভেটিভ প্রশাসনের কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষমতাসীন লেবার সরকারের কড়া নীতির কারণে যুক্তরাজ্যে অভিবাসন এখন নিম্নমুখী। ২০২৩ সালের তুলনায় গত বছর যুক্তরাজ্যে প্রায় ৯ লাখ কম অভিবাসী এসেছে। ২০২৩ সালে নিট অভিবাসন ছিল ৮ লাখ ৬০ হাজার। ২০২৪ সাল ও ২০২৫ সালে নিট অভিবাসন ছিল যথাক্রমে ৪ লাখ ৩১ হাজার ও ১ লাখ ৮৪ হাজার। চলতি বছর তা ঋণাত্মক ৬০ হাজার পর্যন্ত নেমে যেতে পারে। অর্থাৎ যুক্তরাজ্যে প্রবেশের তুলনায় বের হয়ে যাবে ৬০ হাজারের বেশি বিদেশী।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নিট অভিবাসন শূন্যে চলে আসা প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের জন্য রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক। কারণ অভিবাসন ইস্যুতে তার ওপর থেকে চাপ কমবে। তবে চ্যান্সেলর র্যাচেল রিভসের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে। কারণ কম অভিবাসন মানে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমবাজার ও কম রাজস্ব।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল রিসার্চের (এনআইইএসআর) পূর্বাভাস অনুসারে, যদি নিট অভিবাসন শূন্যে নামতে থাকে, ২০৪০ সাল নাগাদ যুক্তরাজ্যের বার্ষিক জাতীয় আয় প্রায় ৩ দশমিক ৭ শতাংশ কমতে পারে। অথচ অফিস ফর বাজেট রেসপনসিবিলিটির (ওবিআর) হিসাব অনুযায়ী, ব্রেক্সিট এরই মধ্যে ব্রিটিশ অর্থনীতিকে প্রায় ৪ শতাংশ পিছিয়ে দিয়েছে।
যুক্তরাজ্যে নিট অভিবাসন কমার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। ২০২৪ সালের মার্চ থেকে স্বাস্থ্যসেবা খাতে সাহায্যকারী কর্মীদের পরিবার আসা বন্ধ করেছে সরকার। এরপর কাজ ও পরিবারভিত্তিক ভিসার বেতনসীমা ২০ হাজার ৪৮০ থেকে বাড়িয়ে করা হয় ৩৩ হাজার ৪০০ পাউন্ড, কিছু ক্ষেত্রে তা ২৫ হাজার পাউন্ড। অধিকাংশ বিদেশী পোস্টগ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীকে পরিবার ছাড়াই থাকতে বলা হয়। দক্ষ কর্মী ভিসার বেতনসীমা ২৬ হাজার ২০০ থেকে বাড়িয়ে করা হয় ৩৮ হাজার ৭০০ পাউন্ড।
সব মিলিয়ে কিয়ার স্টারমার ক্ষমতায় আসার পর সামাজিক যত্ন খাতে বিদেশী কর্মীদের নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। ভিসার যোগ্য চাকরির তালিকা ছোট হয়েছে এবং বেড়েছে আবেদন ফি। স্পন্সর প্রতিষ্ঠানগুলোও এসেছে কঠোর নিয়ন্ত্রণে। আগে শিক্ষার্থীরা কোর্স শেষ করে কম বেতনে কাজ করে ভিসা পরিবর্তন করতে পারতেন। এখন বেতনসীমা দ্বিগুণ হওয়ায় এ পথ বন্ধ।
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির মাইগ্রেশন অবজারভেটরির প্রধান মেডলিন সাম্পশন বলেন, ‘অনেক বিদেশীই এখন যুক্তরাজ্যে অস্থায়ীভাবে আছেন। আমরা জানি না তারা থাকবেন নাকি চলে যাবেন।’
কিংস কলেজ লন্ডনের অর্থনীতিবিদ জনাথন পরটেস বলেন, ‘দুর্বল অর্থনীতির কারণে বিদেশীদের চলে যাওয়া প্রভাব সীমিত হতে পারে। তবে উচ্চ দক্ষতার বিদেশী কর্মীদের চলে যাওয়া মানে হলো দেশের ক্ষতি করা।’
ব্রিটিশ চেম্বার্স অব কমার্সের জেন গ্রাটন বলেন, ‘আতিথেয়তা ও স্বাস্থ্য খাতের ওপর নিট অভিবাসন কমার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের মতে, বিদেশী কর্মী আনা এখন ব্যয়বহুল, সীমিত ও প্রক্রিয়া জটিল।’
ওবিআরের পূর্বাভাস অনুসারে, চলতি বছরে যুক্তরাজ্যে নিট অভিবাসন হবে ২ লাখ ৬২ হাজার। কিন্তু জেমস বোয়েস বলছেন, এ সংখ্যা মাত্র ৪৭ হাজার হতে পারে। এ ব্যবধান সরকারি রাজস্বে ৬০০-৮০০ কোটি পাউন্ড ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।
যুক্তরাজ্যের তুলনায় এখনো ইউরোপের অনেক দেশে অভিবাসন সহজ। বিষয়টি তুলে ধরে অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) ইন্টারন্যাশনাল মাইগ্রেশন বিভাগের প্রধান জঁ-ক্রিস্টফ ডুমঁ বলেন, ‘ব্রিটিশ অভিবাসন নীতি কঠোর হওয়ায় আগের সুবিধা কমে গেছে। জার্মানি উল্টো করছে—তারা তরুণ বিদেশী কর্মী নিয়েছে, যাতে বৃদ্ধ জনসংখ্যা সামলানো সহজ হয়।’